প্রকাশের সময়:
বৃহস্পতিবার ১০ জুন ২০২১ ০৮:১৫:০০অপরাহ্ন

নগরপিতা: মহিউদ্দিন চৌধুরী থেকে রেজাউল করিম চৌধুরী

যে কোন দূর্যোগে নগরবাসীর পাশে ছিলেন নগরপিতারা

ফারুক মুনির:

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নামের সঙ্গে প্রয়াত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নামটি যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। সিটি করপোরেশনের যে কোনো প্রসঙ্গ এলে বা পরবর্তী মেয়রদের কার্যকলাপের মূল্যায়ন করতে গেলে উঠে আসে মহিউদ্দিন চৌধুরীর নাম। আসলে মহিউদ্দিন চৌধুরী সিটি মেয়রের একটি মানদণ্ডে পরিণত হয়ে গেছেন, যার ফলে পরবর্তী মেয়রদের ভালো-খারাপ তুলনীয় হচ্ছে তার সঙ্গে।

যেমন নগরবাসীর সকল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাকে সত্য প্রমাণ করে গত রোববারের (৬ জুন) মাত্র দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে নগরীর অধিকাংশ এলাকা যখন তলিয়ে গেল, তখন নগরপিতা হিসেবে রেজাউল করিম চৌধুরীর নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষুদ্ধ ও হতাশ হয়েছে নগরবাসী।

মহিউদ্দিন চৌধুরী আওয়ামী লীগের নেতা থেকে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের নেতায় পরিণত হয়েছিলেন তার সেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। মানুষের দুর্দশায় তিনি কখনো নিষ্ক্রিয় থাকতে পারেননি। ১৯৯১ সালে শতাব্দির প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে দেশের উপকূল যখন লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে, সমুদ্রতীরবর্তী চট্টগ্রাম নগরও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সে ঘূর্ণিঝড়ে লক্ষাধিক প্রাণহানির সঙ্গে লাখ লাখ গবাদিপশুও পানির তোড়ে ভেসে গিয়েছিল। সেই দুর্যোগকালীন মুহূর্তে মৃতদের সৎকারেও যখন প্রয়োজনীয় লোকের অভাব, তখন তিনি সরকারের সিদ্ধান্ত ও অনুদানের দিকে চেয়ে না থেকে নিজেই নেমে পড়েন দুর্গতদের সেবায়। 

ঘূর্ণিঝড় দুর্গতদের মাঝে মহিউদ্দিন চৌধুরী
ঘূর্ণিঝড় দুর্গতদের মাঝে মহিউদ্দিন চৌধুরী

তার ঠিক তিন বছরের মাথায় বিএনপি ক্ষমতায় থাকতেই চট্টগ্রামের জনগণ তাকে সেই ত্যাগের প্রতিদান স্বরূপ নির্বাচিত করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে। প্রথম নির্বাচিত মেয়র হিসেবে ইতিহাসে নিজের নাম উৎকীর্ণ করেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। মেয়র হয়ে একটুও বদলাননি মহিউদ্দিন চৌধুরী। যে কোনো সঙ্কট বা বিপদে ছুটে গেছেন অকুস্থলে। কালুরঘাটের পোশাক কারখানায় আগুন লাগলে তাদের উদ্ধারে নিরলস পরিশ্রম করেন মহিউদ্দিন চৌধুরী।

পাহাড় উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রাজপথে সোচ্চার থাকার পাশাপাশি জলমগ্ন এলাকায় দিনরাত পানিবন্দি মানুষের পাশে থাকতেন তিনি।

তারপর মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হলেন মঞ্জুর আলম মঞ্জু এবং আ জ ম নাছির উদ্দীন। বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হলেও, মেয়র থাকাকালে মহিউদ্দিন চৌধুরীর পদাঙ্কই অনুসরণ করে গেছেন তার (মহিউদ্দিন চৌধুরী) শিষ্য মঞ্জু। এছাড়াও তিনি পারিবারিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান মোস্তফা হাকিম ফাউন্ডেশনের ব্যানারে নগরবাসীর পাশে থাকতেন সব সময়। 

প্রথম থেকেই বর্ষায় রাতদিন যেখানে পানি জমতো করপোরেশনের টিম নিয়ে ছুটে যেতেন আ জ ম নাছির উদ্দীন। তিনি নাগরিকদের পলিথিন, যত্রতত্র ময়লা ফেলা, নালা-খালে ময়লা ফেলার বিরুদ্ধে সরব থাকতেন। 

বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে দূর্ভোগ হওয়ায় সরেজমিনে খবর নিচ্ছেন আ জ ম নাছির উদ্দীন
বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে দূর্ভোগ হওয়ায় সরেজমিনে খবর নিচ্ছেন আ জ ম নাছির উদ্দীন

দেশে করোনা শনাক্ত হওয়ার পরও প্রায় পাঁচ মাস মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আ জ ম নাছির উদ্দিন। সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি কার্যকর করতে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। নগরীর দুই লাখ ৯৪ হাজার পরিবারের মাঝে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি নিজের ব্যবস্থাপনায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন। 

চসিকের নাছির অধ্যায় শেষ হয় ৬ আগস্ট ২০২০ খোরশেদ আলম সুজনের প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে। সুজন দায়িত্ব নিয়ে দুই-একটি সড়ক ছাড়া নগরীর প্রায় প্রতিটি সড়কের উন্নয়ন করেন। জলমগ্ন এলাকায় দুর্ভোগ লাঘবে দাঁড়িয়ে থেকেই করপোরেশনের কর্মীদের কাজে লাগিয়েছেন।

বৃষ্টির পানি দ্রুত সরাতে জলমগ্নস্থানে টিম নিয়ে প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন
বৃষ্টির পানি দ্রুত সরাতে জলমগ্নস্থানে টিম নিয়ে প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন

কিন্তু এবার নগর ডুবলো। নগর পিতার চেয়ারে আছেন নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী। কিন্তু তাকে আগের মেয়র-প্রশাসকের মতো জলমগ্ন নগরবাসী পাশে পায়নি। তবে তার ফেসবুক ওয়ালে প্রকাশ করা ভিডিও ও স্থিরচিত্রে দেখা গেছে, চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মীরা আবর্জনা সরাচ্ছে। নালা-নর্দমা পরিষ্কার করছে। কিন্তু কোনো জলাবদ্ধ এলাকায় নগরপিতার উপস্থিতির চিত্র দেখা যায়নি।

তবে খবর নিয়ে জানা গেছে, রেজাউল করিম বহদ্দারহাটের বাসভবন থেকে প্রতিদিন আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার হয়ে টাইগারপাশে নগর ভবনে গেলেও, ৬ জুন গিয়েছেন বাকলিয়া নতুনব্রিজ, নিউমার্কেট হয়ে। এতে তিনি নিজে জলাবদ্ধতার ভোগান্তি এড়াতে পারলেও, ভোগান্তির শিকার লাখ লাখ নাগরিকের খবর নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেননি ।

নগরপিতার এমন আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

জলাবদ্ধতার সময় পাশে না পাওয়া বিষয়ে জানতে মেয়রের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

মহানগর নিউজ/আরসি

 



আরও খবর